নিজস্ব প্রতিবেদক:

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক নির্মাণের কাজ ৮ সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে সায়মন ব্রিজ পর্যন্ত সৈকত এলাকায় চলমান নির্মাণকাজে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি জে বি এম হাসানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, উচ্চ আদালতের পূর্বের নির্দেশনা অমান্য করে সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে। এতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়া সমুদ্রসৈকতের নির্ধারিত এলাকায় নির্মাণকাজ করার ক্ষেত্রে আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশেষ করে কক্সবাজার পৌরসভা এলাকার সমুদ্রতীরবর্তী প্রথম ৩০০ মিটার এলাকাকে ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এ এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণের ওপর উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে।

এর আগে কক্সবাজার পৌরসভার উদ্যোগে এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা—জাইকার অর্থায়নে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে সায়মন বিচ এলাকায় প্রায় ১ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ শহর রক্ষা বাঁধ ও সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় বালিয়াড়ি ভরাট ও সমতল করার অভিযোগ ওঠার পর থেকেই পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এর আগে দাবি করেছিল, উপকূলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা এবং শহরের সুরক্ষার স্বার্থে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় জরিপ, নকশা ও গবেষণার ভিত্তিতেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তারা আগে জানিয়েছিলেন, ইসিএভুক্ত এলাকায় বড় ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রয়োজন এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নথিপত্র চাওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)। পরিবেশবাদীদের মতে, সৈকতের বালিয়াড়ি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ নয়; এটি জলোচ্ছ্বাস, ঝড়, ঢেউ ও উপকূলীয় ভাঙনের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় উদ্ভিদাঞ্চল লাল কাঁকড়া, সামুদ্রিক কচ্ছপসহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাস ও প্রজনন পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এর আগে বালিয়াড়িতে নির্মাণকাজ বন্ধের দাবিতে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন আন্দোলন ও আইনি পদক্ষেপ নেয়। তাদের অভিযোগ, বালিয়াড়ি কেটে বা ভরাট করে অবকাঠামো নির্মাণ করলে দীর্ঘমেয়াদে কক্সবাজারের উপকূলীয় সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

আদালতের সর্বশেষ এ আদেশের ফলে আগামী আট সপ্তাহ সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে সায়মন ব্রিজ পর্যন্ত বালিয়াড়িতে চলমান নির্মাণকাজ বন্ধ থাকবে। এ সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প, পরিবেশগত অনুমোদন এবং উচ্চ আদালতের পূর্ববর্তী নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়গুলো নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসবে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।

কক্সবাজারের পরিবেশ সচেতন মহলের দাবি, উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করলেও দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করেই ভবিষ্যতের সব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।